Saturday, October 3, 2015

২৯-১২-২০১৪
আজ খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠতে হলো। কারণ আজকে আমার গন্তব্যস্থান হচ্ছে ভালোবাসার শহর ‘আগ্রা’। দিল্লী থেকে আগ্রা অনেকভাবে যাওয়া যায়। বিশেষ করে দিল্লী থেকে আগ্রা পর্যন্ত কমপক্ষে ৯৪টি ট্রেন আছে। তবে আমার মনে হয় সবথেকে সহজ এবং কম ঝামেলাপূর্ণ পদ্ধতি হচ্ছে ‘টুরিস্ট বাস’। আগের দিন হোটেল থেকেই আমি এর টিকিট কেটে রেখেছিলাম। ‘নিউ রাজধানী’ নামে একটি ট্রাভেল কোম্পানির বাস ভোর ছ’টায় দিল্লীর হোটেল থেকে টুরিস্টদেরকে তুলে নেয়। তাদের গন্তব্য ২০৬কিঃমিঃ দুরের শহর আগ্রা। সেখানে তারা প্রথমে নেয় আগ্রা দুর্গে। তারপর কিছু সুভ্যনির দোকানে, তারপর দুপুরে খাবার জন্য হোটেলে আর সেখান থেকে তাজমহল। তাজমহল দেখা শেষ হলে নিয়ে যায় ৩৭কিঃমিঃ দূরের ‘ফতেপুর সিক্রি’তে। ফতেপুর সিক্রি দেখা শেষ হলে আবার দিল্লীর উদ্দেশ্যে যাত্রা। রাত ১২টার দিকে নামিয়ে দেয় দিল্লীতে হোটেলের সামনে। হিসেব করে দেখলাম একদিনে প্রায় ৫০০কিঃমিঃ যাত্রা। টিকিট মাত্র ৫০০রুপি।




হোটেল থেকে বের হয়ে যখন বাসে উঠলাম তখন ভোর ৬টা। প্রচন্ড ঠান্ডা আর ভয়াবহ কুয়াশা। ঘন্টাখানেক ধরে বাস দিল্লীর এমাথা থেকে ওমাথা পর্যন্ত ঘুরে ঘুরে অপেক্ষারত যাত্রীদেরকে তুলে নিল। আর তারপর আগ্রার উদ্দেশ্য যাত্রা শুরু হলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাস হাইওয়েতে উঠে আসলো। মুগ্ধ হবার মতো হাইওয়ে এটি। প্রতিটি রাস্তা ৮লেন করে প্রশস্থ। কোন কোন জায়গায় সেটি ২৪লেনে গিয়ে ঠেকেছে। তবে এ রাস্তায় কিছুদূর পরপর টোল পরিশোধ করতে হয়।

কুয়াশার পরিমাণ এতো বেশী যে সামনের ১ফুট রাস্তাও দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু ড্রাইভার বাস খুব দ্রুত চালাতে পারছে কারণ রাস্তাগুলো এভাবেই তৈরী। এদিন ছিল এই এলাকার ৩০বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা। যা ছিল ২ডিগ্রীরও নীচে। যেহেতু সেখানকার তাপমাত্রা সম্পর্কে আমার কোন পূর্বধারনা ছিলনা, এজন্য আমি খুব বেশি শীত-পোশাক নিয়ে যায়নি। যার ফলাফল আমাকে হাড়ে হাড়ে ভোগ করতে হয়েছিল।

ঘন্টাখানেক পর বাস হাইওয়ের এক স্টপেজে থামলো। টয়লেটের ব্যাবস্থা খুবই ভালো। তবে খাবারের দাম অনেক বেশি। ২০রুপির চা খেয়ে কিছুটা প্রাণ ফিরলো। ২০মিনিট যাত্রা বিরতির পর আবার বাস চলা শুরু করলো। আরো ঘন্টা দুয়েক চলার পর পৌঁছলাম আগ্রাতে। সূর্য ততোক্ষণে উঁকি মারা শুরু করেছে। বেলা তখন ১২টা। বাস থামলো আগ্রা ফোর্টের সামনে।

সবার আগে বাস থেকে নেমে দৌড় দিলাম টিকিট কাউন্টারের দিকে। ২০রুপির ভারতীয় টিকিট কেটে দু’দফার চেকিং শেষে ঢুকে গেলাম দুর্গের ভেতরে। যেখানে পুরো দুর্গ দেখতে সময় লাগে পুরো ২দিন, বাস থেকে সেখানে সময় দিয়েছে মাত্র ৪৫মিনিট। প্রথমে দুর্গের বাজার, তারপর পাথরের তৈরী অনেকখানি ঢালু পথ পেরিয়ে মূল দুর্গ। অনেকগুলি প্রাসাদ রয়েছে সেখানে। আর খুব সুন্দর করে সাজানো বাগান। ভিতরে অবশ্য সব জায়গায় যাবার অনুমতি নেই। দুর্গ থেকে নাকি দুরের তাজমহল দেখা যায়। কিন্তু কুয়াশার কারণে সেরকম কিছুই দেখতে পেলাম না।











আগ্রা দুর্গ দেখা শেষ হলে নিয়ে গেল এক দোকানে। যেখানে তাজমহলের ৫ফুট উঁচু এক হুবহু প্রতিকৃতি রয়েছে। এটাকে বেবিতাজ বলা হয়। পুরো ঘর অন্ধকার করে এই বেবিতাজের উপর বিভিন্ন শেপের আলো ফেলা হলো। ভোরের আলোয় অথবা চাঁদনি রাতে তাজমহল যে কতোটা ভয়াবহ আকর্ষণীয় হয় তা অবলোকন করলাম।

বেবিতাজ থেকে বের হয়ে দুপুরে খাবার জন্য এক হোটেলে নিয়ে গেল। খুব সুন্দর সাজানো গোছানো পরিচ্ছন্ন ছিমছাম এক হোটেল। আমি আমার পুরো আট দিনের ভারত ভ্রমণে সবচেয়ে ভালো খাবার এই হোটেল থেকেই খেয়েছিলাম। এটি ছিলো ‘বাঙালি থালি’। ঘন্টাখানেকের মধ্যাহ্নভোজ বিরতির পর আবারো বাসে উঠলাম। এবারের গন্তব্য ‘তাজমহল’।

তাজমহলের টিকিট বাসের গাইড কেটে দিল। টিকিট ২০রুপি আর জুতোর উপরে পড়ার জন্য এক ধরনের বিশেষ মোজা যার দাম ১০রুপি। এটা ভারতীয়দের জন্য। বিদেশিদের জন্য তাজমহলের টিকিট ৭৫০রুপি। যেহেতু বাসে আমি কোন কথা বলিনি সেহেতু গাইড আমাকে ভারতীয় ভেবে ২০রুপির টিকিটই দিল। আসলে কম কথা বলার সুবিধা অনেক।

তাহমহলের গেটের ২কিঃমিঃ আগে বাস থেকে নামিয়ে দিলো। সময় দিলো সোয়া এক ঘন্টা। এখান থেকে ঘোড়ায় টানা গাড়ি অথবা ইজিবাইকে করে গেট পর্যন্ত যেতে হয়। এটা ছাড়াও শুনেছি অন্য আরেকদিকের প্রবেশ পথ আছে। দুরুদুরু বক্ষে গেটের কাছে হাজির হলাম। শুনেছি অনেক বাংলাদেশীরা টিকিটের দু’নম্বরী করতে গিয়ে এখানে ধরা খেয়ে প্রচুর অপদস্থ হয়েছে। গেটের কাছে দেখলাম পুরুষ ও মহিলাদের জন্য আলাদা প্রবেশ লাইন আর সেখানে খুব কড়া টিকিট চেকিং হচ্ছে। অনেক দর্শনার্থীকে লাইন থেকে বের করেও দিচ্ছে। খুব ভয়ে ভয়ে ২০রুপির টিকিট দেখালাম। টিকিট চেক করে ফেরত দিয়ে ভিতরে প্রবেশের ইঙ্গিত করলো। হাঁপ ছেড়ে বাঁচতে গিয়ে আবার দম আটকে আসলো। আবার চেকিং। এবার পুরো শরীর চেক করবে। পুরুষ ও মহিলাদের জন্য আলাদা পর্দাঘেরা জায়গা। সেখানে হাত আর যন্ত্রের সাহায্যে পুরো শরীর চেক করে। আমি আমার পাসপোর্ট নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলাম। গার্ডরা এটা খুঁজে পেলে খবর ছিল। পাসপোর্টটা ছিলো আমার জ্যাকেটের ভিতরের বুক পকেটের মধ্যে। ওই জায়গাটার উপর হাত বুলিয়ে গেলেও মোটা কাপড়ের মধ্যে পাতলা পাসপোর্টটা গার্ড খুঁজে পেল না। পিছনে লাইন ক্রমশ বড় হয়ে যাচ্ছিল বিধায় আমাকে ছেঁড়ে দিল। ব্যাপারটা যে মিটে গেছে তখনো আমার ঠিক বিশ্বাস হয়নি। যতো দ্রুত সম্ভব এই এলাকা ছেঁড়ে পালালাম।


গার্ডরুম থেকে বেশ খানিকটা হেঁটে তাজমহলের দরজা। দরজা পার হলে পানির সুদৃশ্য ফোয়ারা আর তার দুপাশে সাজানো বাগান যার মাঝখান দিয়ে পায়ে হাঁটা পথ চলে গেছে। আশেপাশে বিস্তীর্ণ খোলা ঘাসের চত্ত্বর যেখানে শয়ে শয়ে কাঠবিড়ালি ঘুরে বেড়াচ্ছে। এগুলি পেরিয়ে তাজমহলের মূল বেদি। নির্দিষ্ট জায়গায় এসে জুতোর উপরে সাদা কাপড়ের মোজা পড়তে হয়। অবশেষে তাজমহল স্পর্শ করতে পারলাম আর নিজের মধ্যে এক অদ্ভুত শিহরণ অনুভূত হলো।

তাজমহলের রুপ যেন ধবধবে সাদা এক রাজহাঁস। মুকুট পরা রাজেন্দ্রাণীর মতো সে মাথা উঁচু করে সগর্বে দাঁড়িয়ে আছে। পিছনের শীর্ণকায়া যমুনা দেখে অবশ্য খুব তৃপ্তি পেয়েছি। লম্বা লাইন ধরে ধীরে ধীরে আরো উপরের তলায় উঠলাম। একপাশের মিনারের সংস্কার কাজ চলছে। তাজমহলের সব কক্ষে প্রবেশ করা যায় না। তবে যে জায়গাগুলোতে যাওয়া যায় সেখানের সব জায়গার ছবি তোলা বা ভিডিও করা যায়, শুধুমাত্র যে ঘরটিতে শাহাজাহান আর মমতাজের কবরের ডেম্যু রয়েছে সেখানটি ছাড়া। ঘন্টাখানেকের লম্বা লাইন পেরিয়ে ঘরটিতে ঢুকতে হয়। অন্ধকারাচ্ছন্ন এই ঘরের অপূর্ব কারুকার্যখচিত পাথরগুলিতে আলো ফেললে এই আলো পাথর ভেদ করে অপার্থিব আভার মতো ঠিকরে বের হয়ে আসে।







কিভাবে যে সময় পার হয়ে গেল একেবারেই টের পেলাম না। ততোক্ষণে সোয়া একঘন্টা পেরিয়ে গেছে। আসলে লাইনে দাঁড়িয়েই বেশি সময় খরচ করে ফেলেছি। ঝেড়ে দৌড়ানো শুরু করলাম। অনেক কষ্টে বাসস্টপে ফেরত আসলাম। কিন্তু আসল সমস্যা শুরু হলো এবার। বাস খুঁজে পাচ্ছি না। মানে বাস থেকে যে ঠিকানা দিয়েছিল সেখানে বাস নেই। প্রথমে মাথা খারাপ হয়ে যাবার মতো অবস্থা হলো। কিন্তু একটু ভেবে দেখলাম বাসে শুধুমাত্র আমার একটা পানির বোতল আছে। তাছাড়া টাকা-পয়সা পাসপোর্ট সব আমার কাছে। আগ্রার স্টেশনে গিয়ে যেকোন ট্রেনে আমি দিল্লী ফেরত যেতে পারি। এবার একটু স্বস্তি পেলাম।

নতুন এডভেঞ্চারের চিন্তায় মশগুল হয়ে জলবিয়োগের জন্য আশেপাশে একটু জায়গা খুঁজতে গিয়ে বাসটা খুঁজে পেলাম। আসলে হয়েছিল কি বাসটা আমাদের যে জায়গার ঠিকানা দিয়েছিল সেই নির্দিষ্ট জায়গায় না দাঁড়িয়ে একটু পাশে অন্য জায়গায় পার্ক করেছিল। ভাগ্যিস আমার কাছে বাসের নম্বর প্লেটের ছবি তোলা ছিল। সেটা মিলিয়েই বাসটা খুঁজে পেলাম। যাক অবশেষে বাসটা খুঁজে পেলাম এবং এ উপলক্ষে একটা বড়সড় স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম। বাসে উঠে দেখি দেড় ঘন্টা পেরিয়ে গেলেও সবাই এখনো উপস্থিত হয়নি। অবশেষে আস্তে আস্তে সবাই আসলো আর বাস ছেড়ে দিলো। এবারের গন্তব্য ৩৭ কিঃমিঃ দূরের ফতেপুর সিক্রি।

প্রায় ঘন্টাখানেক পর বাস এসে থামলো পাহাড়ের নিচে। মোঘল সম্রাট আকবরের একসময়ের রাজধানী ফতেহপুর সিক্রি। বাস থেকে নেমে অনেকগুলি খাড়া সিঁড়ি ভেঙ্গে উপরে উঠতে হয়। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলে প্রথমেই পড়ে বিখ্যাত ‘বুলওয়ান্দ দরওয়াজা’। এটি নাকি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দরজা। আর এই দরজা দিয়ে ভীতরে প্রবেশ করলেই যেন রুপকথার জগৎ। পাথরের দুর্গের যে এতো রুপ থাকতে পারে, আর তার উপরে যে এতো নকশার কারুকার্য করা সম্ভব সেটি এখানে না এলে বোঝা যাবে না। এখানে আছে খাজা সেলিম চিস্তির দরগা। কথিত আছে, নিঃসন্তান সম্রাট আকবর সন্তান কামনায় পীর খাজা সেলিম চিস্তির দ্বারস্থ হলে তার দোয়ায় সম্রাটের হিন্দু মহিষী যোধাবাই-এর গর্ভে জন্ম নেয় এক পুত্র সন্তান। গভীর কৃতজ্ঞতায় সম্রাট আকবর পীর খাজা সেলিম চিস্তির সাধনভূমিতে গড়ে তোলেন ‘ফতেহপুর সিক্রি’। সব ধর্মের মানুষ দেখলাম টাকার বিনিময়ে এই দরগায় মানত করছে। ব্যাপারটি আমার কাছে ব্যাবসায়িক কর্মকান্ড বলে মনে হয়েছে।


এছাড়া এখানে রয়েছে যোধাবাইয়ের মহল, তানসেনের জলসা ঘর, অপূর্ব ডিজাইনের পিলারের উপর সম্রাটের আলোচনা কক্ষ যার চারদিকে চারজন মণিষির বসার জায়গা, অপরুপ কারুকার্যের মসজিদ, সুদৃশ্য কবর আর আরো অনেক কিছু। অনেকগুলি কবর পার হয়ে এক গুপ্ত কক্ষে যেতে হয়, যেখানে রয়েছে সুড়ঙ্গ। এই সুড়ঙ্গ দিয়ে নাকি খুব সহজেই তাজমহলে যাওয়া যায়। সুড়ঙ্গটির দরজায় বড় একটা তালা। আধাঘন্টার ভেতরে সবকিছু দেখতে হলো। কারণ ততোক্ষণে সূর্য ডুবে গিয়েছে, আর ভয়ঙ্কর কুয়াশাও তার প্রভাব বিস্তার শুরু করেছে। তাজমহলের চাইতেও এই দুর্গটি আমার কাছে বেশি ভালো লেগেছে। শুধুমাত্র ‘ফতেপুর সিক্রি’ দেখার জন্য হলেও একবার আগ্রাতে আসা উচিৎ।



ফতেপুর সিক্রি দেখা শেষে বাস চলা শুরু করলো। জ্যামের কারণে আগ্রা শহর পার হতে অনেক সময় লাগলো। ঘন্টা দু’য়েক পর বাস এক ধাবায় এসে ঘন্টাখানেকের বিরতি দিলো। তারপর আবার শুরু হলো দিল্লীর উদ্দেশ্যে যাত্রা। ভয়াবহ কুয়াশা পার হয়ে রাত এগারোটার পরে বাস দিল্লীতে আমার হোটেলের সামনে থামলাম। রাতের খাবার খেয়ে হোটেলে ঢুকলাম। পরদিন আমার কলকাতায় যাবার ট্রেনটির নাম ‘দুরন্ত এক্সপ্রেস’। যেটিকে আমার কাছে ‘রাজধানি এক্সপ্রেস’ এর চাইতেও অনেক বেশি দুর্দান্ত মনে হয়েছিল।


কলকাতার গল্প অন্য কোন এক সময় হবে।

*নোট( আমি আমার তিনবারের ভারত ভ্রমণে দেখেছি, কোথাও এরা রুপি ভাঙ্গিয়ে দিতে চায়না। এমনকি ১৫রুপির জিনিস কিনে ২০রুপির নোট দিলেও বলবে ভাঙ্গতি নেই। দরকার হলে পণ্যের দাম পর্যন্ত নেবে না। অতএব কিছু কেনার আগে পুরো ভাংতি সংগ্রহে রাখুন।)
কলকাতা দিল্লী আগ্রা নামে ব্লগে অনেক লেখা। আছে আমার এই লেখাটি আপনাদের জন্য আরেকটু বেশি সহায়ক। এর কারণটা হচ্ছে এটি বেশ কম খরচের একটা ট্যুর। ৮ দিনের এই ট্যুরে আমার খরচ হয়েছে সর্বমোট ১৩,০০০ টাকা। এরমধ্যে ৭,০০০ টাকা ট্রেন ভাড়া বাকি অন্যান্য খরচ। তাহলে বুঝতেই পারছেন আমার মতো ছাত্ররা বিশেষ করে যাদের নির্দিষ্ট কোন আয়ের উৎস নেই তাদের জন্য এই লেখাটি বেশ প্রয়জনীয়। তবে খরচের হিসাব যশোর থেকে, কারণ সেখান থেকেই আমার ট্যুর শুরু। ঢাকা থেকে গেলে খরচ আরও ১,০০০ বেশি পড়বে।

কলকাতার ট্রাম
২০১৪’র ডিসেম্বরের ২৬ তারিখ সকাল সাড়ে সাতটায় আমার বাবার সাথে তার মটরবাইকে বেনাপোলের উদ্দ্যেশে রওনা দিলাম। বছরের সবচেয়ে বেশি শীত এবং কুয়াশা পড়া শুরু করেছ সেদিন থেকেই। প্রচন্ড ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে ন’টার দিকে পৌছে গেলাম বেনাপোল ইমিগ্রেশনে। পরিচিত লোকের মাধ্যমে বর্ডার ক্রস করলাম কোনরকম চেকিং ছাড়াই। ইন্ডিয়ান ইমিগ্রেশন ৫ মিনিটে শেষ হলো। টাকাকে রুপিতে বদলে নিয়ে ২৫ রুপির অটো ভাড়ায় বনগাঁ রেল স্টেশনে আসলাম।
নোট*(বর্ডার পার হবার সময় বাংলাদেশ সরকারকে ভ্রমণ কর বাবদ ৫০০ টাকা জমা দিতে হয়। বাংলাদেশী দালালকে ১০০ ও ইন্ডিয়ান দালালকে ১০০। তবে দালাল না ধরে আপনি নিজেই ইমিগ্রেশনের কাজগুলি করতে পারেন।)

কলকাতার সবচেয়ে বড় মসজিদ (নাখোদা মসজিদ)
বনগাঁ স্টেশন থেকে ৯.৫০র ট্রেনে উঠলাম কলকাতার দমদমের উদ্দ্যেশে। এখানকার ট্রেনগুলি সব ইলেক্ট্রিকের সাহায্যে চলে। ১৫ রুপির ভাড়া মাঝে প্রায় ২০টি স্টেশন পার হয়ে ঘন্টা দেড়েক পরে পৌঁছলাম দমদম স্টেশন। সেখানে প্ল্যাটফর্ম বদলে মেট্রো স্টেশন এসে উঠলাম। এম জি রোডের টিকিট কাটলাম ১০ রুপি দিয়ে। ৫ থেকে ৬মিনিটে পৌছে গেলাম এম জি রোড।

হাওড়া ব্রীজ
মেট্রো থেকে বের হয়ে ৭ রুপির ভাড়ায় বাসে উঠলাম। বিখ্যাত হাওড়া ব্রীজ পার হয়ে এসে নামলাম হাওড়া স্টেশনে। আমার দেখা সবচেয়ে বড় স্টেশন এটি। ২৩টি প্ল্যাটফর্মে দৈনিক ৬৫০’র বেশি ট্রেন আর ১০লক্ষের বেশি মানুষ চলাচল করে এই স্টেশন দিয়ে। আমার ট্রেন ছিল বিকাল ৪.৫৫ মিনিটে। নাম ‘রাজধানী এক্সপ্রেস’। এই ট্রেনের থ্রী টায়ারের টিকিট আমি ঢাকা থেকেই দু’মাস আগে এক ট্রাভেল এজেন্সি থেকে কেটে এসেছিলাম। ২০৭০ রুপির টিকিট আমার কাছ থেকে নিয়েছিল ৩৪০০ টাকা।

ফেরত আসার সময় রাতে তোলা হাওড়া ষ্টেশন
নোট*(কলকাতায় ফেয়ারলি প্যালেস নামে একটি জায়গা আছে। যেখান থেকে ‘ফরেন কোটায়’ টিকিট কাটা যায়। এখানে ভিসাসহ পাসপোর্ট দেখাতে হয়। সাধারনত দু’একদিন আগেও ‘ফরেন কোটায়’ টিকিট পাওয়া যায়। ভারতে রেলের উপর এতো চাপ যে দেড় মাস আগে থেকে ‘জেনারেল কোটায়’ টিকিট পাওয়া যায় না।)
ট্রেন ছাড়তে যেহেতু দেরি আছে তাই ওয়েটিং রুমে গেলাম। দ্বোতলায় এসি রুম। যেখানে টয়লেট এবং গোসলের সুব্যাবস্থা আছে। লাগোয়া বারান্দা থেকে হুগলী নদী, হাওড়া ব্রীজ আর নদীর ওপারের কলকাতার অসাধারণ ভিউ আসে। সেখানে কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে স্টেশনের মাটির নীচের পথ বেয়ে ফেরিঘাট এলাম। ৫ রুপির টিকিট কেটে বিবাদী বাগের ফেরিতে উঠলাম। যেখানে ফেরি থামলো সেটিই ‘ফেয়ারলি প্যালেস’ ভবন। এছাড়া এখানে ‘মিলেনিয়াম পার্ক’ নামে নদীর ধার দিয়ে খুব সুন্দর উদ্যান গড়ে তোলা হয়েছে। সেখান থেকে হাঁটতে হাঁটতে বিখ্যাত ‘ইডেন গার্ডেন’ স্টেডিয়ামে গেলাম। এতো বড়ো স্টেডিয়াম যে তার পাশে কতগুলি লোকাল রেল স্টেশন আছে। এরপর গেলাম নিউ মার্কেট। সেখানে কিছুক্ষণ ঘোরাফিরা করে ‘আরাফাত হোটেলে’ দুপুরের খাবার খেয়ে দেয়ে আবার রওনা দিলাম হাওড়া স্টেশনের উদেশ্যে।

ডিসপ্লে বোর্ড
ডিজিটাল বোর্ডে দেখলাম আমার ট্রেনটি ছাড়বে ৯নাম্বার প্ল্যাটফর্ম থেকে। অনেক লম্বা একটা ট্রেন। খুঁজে খুঁজে আমার নির্ধারিত বগিটি বের করলাম। দরজার পাশে সকল যাত্রীর নাম আর সিট নাম্বার সাঁটানো রয়েছে। আমার ৩১নং সিটটি খুঁজে পেলাম। থ্রী টায়ার মানে হচ্ছে পুরো এসি একটি বগি যেখানে মোট ৯টি ইউনিট রয়েছে। প্রতিটি ইউনিটে একপাশে তিনটি তার মুখোমুখি তিনটি ও অন্যপাশে দু’টি শোবার ব্যবস্থা রয়েছে। অস্ত্রসহ গার্ড কুকুর দিয়ে পুরো ট্রেন চেক করালো। ট্রেন ঠিক ৪.৫৫তেই ছাড়লো, আর তারপর রেলের লোক এসে প্রতিটি যাত্রীর জন্য একটা বালিশ, দুটো চাদর আর একটা কম্বলের প্যাকেট এবং এক বোতল পানি দিয়ে গেল। ভেজ অথবা নন-ভেজ কোন যাত্রী কি খাবে তার অর্ডার নিয়ে গেল। প্রায় ১৫০০ কি.মি. দূরের দিল্লী যেতে ‘রাজধানী এক্সপ্রেসের’ ১৭ঘন্টা লাগার কথা। আমি মোট ৭বার খাবার পেয়েছিলাম, কারণ ঘন কুয়াশার কারণে ট্রেনটির প্রায় ২৩ঘন্টা সময় লেগেছিলো।রাতের খাওয়া শেষে শুয়ে পড়লাম। বড় জানালা দিয়ে মাঝে মাঝে বাইরের আলো দেখা যাচ্ছিলো। ট্রেনটির গতি ছিলো ঘন্টায় ১২০ কি.মি.।
সকালে ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। কিছুক্ষণ পর খাবার আসলো। ট্রেন তখন ঘন কুয়াশার কারণে ‘কানপুর স্টেশনে’ দাঁড়িয়ে আছে। এতো কুয়াশা আমি আমার জীবনে দেখিনি। ট্রেন থেকে নেমে কিছুক্ষণ স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকলাম। ইন্ডিয়ার স্টেশগুলি সত্যিই খুব বড়ো আর সুযোগ-সুবিধাসম্বলিত।
ঘন্টাখানেক পর ট্রেন ধীরে ধীরে চলা শুরু করলো। বড়ো জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকলাম। প্রকৃতি তখন রুক্ষ হওয়া শুরু করেছে।
ট্রেন থেকে দুপুরের খাবার দিলো। এবং তারপর পানমসলা, অর্থাৎ বকশিস দিতে হবে। সামানের ভদ্রলোকের দেখাদেখি আমিও ১০রুপির একটা নোট দিলাম। অবশেষে প্রায় ২৩ঘন্টা পর ‘রাজধানি এক্সপ্রেস’ ‘নিউ দিল্লী’ স্টেশনে পৌছাল। ট্রেন থেকে নামলাম। অচেনা ভাষার অপরিচিত দেশে সম্পূর্ণ একা আমি। এবার থাকার জন্য একটা হোটেল খুঁজে বের করতে হবে।

নিউ দিল্লী রেলস্টেশন
২৭-১২-২০১৪
‘নিউদিল্লী’ রেলস্টেশনে এসে পৌঁছালাম দুপুর তিনটে নাগাদ। কলকাতা থেকে এসেছি ‘হাওড়া-নিউদিল্লী রাজধানী এক্সপ্রেস’ ট্রেনে করে। কলকাতা থেকে দিল্লী পর্যন্ত ১৭টিরও বেশী ট্রেন আছে। ভাড়া সর্বনিম্ন ৩৫০ থেকে সর্বচ্চো ৪,৮০০ রুপি । আমি ঢাকা থেকে ‘থ্রী-টায়ার’ ক্লাসের ২০৭০ রুপির টিকিট এক ট্রাভেল এজেন্সি থেকে কেটেছিলাম ৩,৪০০ টাকায়। কলকাতা থেকে ‘স্লিপার’ ক্লাসের টিকিট কাটলে খরচ পড়তো ৬০৫ রুপি। আমার ১৩,০০০টাকার ট্যুর খরচ এক ধাক্কায় কমপক্ষে ৪,০০০টাকা কমে নেমে আসতো ৯,০০০টাকারও নীচে। যাইহোক, নিউদিল্লী রেলস্টেশনে ট্রেন থেকে নেমে এক বাঙ্গালী ভদ্রলোকের সহায়তায় মেট্রো স্টেশনটি খুঁজে পেলাম। নিউদিল্লী স্টেশনের ১৬নং প্ল্যাটফর্ম দিয়ে বাইরে বের হলেই মেট্রো স্টেশন। সেখানে মাটির নিচে ঢুকে ৮ রুপির ‘চাউরি বাজার’ এর টিকিট কাটলাম। এটি হলুদ লাইনের মেট্রো। টিকিট কাটা শেষে লাইনে দাঁড়াতে হয় পুরো শরীর আর লাগেজ চেক করার জন্য। চেকিং শেষে কয়েক ধাপের চলন্ত সিঁড়ি বদলে ঢুকে গেলাম মাটির আরো নীচের প্লাটফর্মে। সঙ্গে সঙ্গে ট্রেন আসলো। রাশ আওয়ারে প্রতি ২০সে. পরপর ট্রেন আসে। উঠে পড়লাম মেট্রোতে। পরের স্টপেজই ‘চাউরি বাজার’। আসতে এক মিনিটও লাগলো না। ‘চাউরি বাজার’ স্টেশনটি দিল্লীর সবথেকে গভীরের মেট্রো স্টেশন। এটি মাটির ৯৮ফিট নীচে অবস্থিত। এতো নীচের আলো ঝলমলে একটা স্টেশন দেখলে সত্যিই অবাক হতে হয়। ট্রেন থেকে নেমে কয়েকবার চলন্ত সিঁড়ি বদলে মাটির উপরে উঠে এলাম। আর সুরঙ্গ থেকে বের হয়ে যা দেখলাম তা হচ্ছে এই এলাকাটি পুরানো ঢাকার ‘শাঁখারী বাজারের’ চাইতেও ঘিঞ্জি একটি জায়গা।





বাংলাদেশ থেকে আসার আগে আমি একটি হোটেলের ঠিকানা নিয়ে এসেছিলাম। অনেক খুঁজে খুঁজে সেটি বের করলাম। দিল্লী জামে মসজিদের ১নং গেটের পাশে অবস্থিত হোটেলটির নাম হচ্ছে ‘HOTEL SHAN’. সরু এবং লম্বা একটা সিড়ি বেয়ে হোটেলের দ্বোতলায়
উঠতে হয়। সেখানেই রিসিপশন। সিঙ্গেল রুম খালি না থাকায় একটা ডাবল রুম নিলাম দৈনিক চারশ রুপি ভাড়ায়। সাথে ৫০রুপির RC খরচ। রুমে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে বাইরে বের হলাম।




নোট*(‘নিউদিল্লী’ স্টেশনের পাশে অনেক হোটেল আছে। কিন্তু আমি শুনেছি সেখানে ঠগ-জোচ্চর লোকের সংখ্যা বেশি। এজন্য পুরানো দিল্লী থাকাটাই ভালো। পুরানো দিল্লীতে হোটেল খরচ অনেক কম। অবশ্য মানও তেমন আহামরি কিছু না। তবে পুরানো দিল্লীতে থাকার সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে এখানে দিল্লী জামে মসজিদ, লাল কেল্লা, চাঁদনী চক সহ বেশ কিছু দর্শনীয় স্থান একেবারে হাতের নাগালের মধ্যেই। তাছাড়া এখানে খাবারের হোটেলগুলিতে মুসলিমদের প্রাধান্যই বেশি। যাদের পূর্বপুরুষেরা মোঘল সম্রাটদের বাবুর্চি ছিল।)




জামে মসজিদের ১নং গেটের পাশে অবস্থিত বিখ্যাত সব খাবারের দোকানগুলি। তার মধ্যে সবথেকে বিখ্যাত “করিম’স”-এ ঢুকলাম রাতের খাবার খাওয়ার জন্য। দোকান জুড়ে শুধুই সাদা চামড়ার বিদেশী। মেন্যু কার্ড দেখে যে খাবারের অর্ডার দিলাম সেটি নেই। বাধ্য হয়ে চিকেন বিরিয়ানি নিলাম। যতোটা প্রত্যাশা নিয়ে মুখে দিলাম ঠিক ততোটাই আশাহত হতে হলো। স্বাদ খুব বেশি ভালো লাগেনি। তাছাড়া দামও খুব বেশি। আমার মনে হয় দিল্লীবাসী যদি একবার ঢাকার কোন ‘ছালাদিয়া’ টাইপ হোটেলের বিরিয়ানি দূরে থাক, তেহেরিও মুখে দেয় তাহলে তারা তাদের দেশের বিখ্যাত হোটেলগুলির বিখ্যাত বিরিয়ানির দিকে আর ফিরেও তাকাবে না।

রাতের খাওয়া শেষে হোটেলে ফেরত এসে খুব দ্রুত ঘুমিয়ে পড়লাম। কারণ পরদিন ভোর থেকে আমার দিল্লী পরিক্রমা শুরু হবে।

২৮-১২-২০১৪
খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে হোটেল থেকে বের হলাম এবং বের হয়ে যে জিনিসটি দেখলাম সেটি হচ্ছে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। ভয়াবহ কুয়াশা এবং প্রচন্ড ঠান্ডা। কুয়াশার পরিমান এতোই বেশি যে নিজের হাত-পা পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না। পরে জেনেছিলাম ঐ দিন দিল্লীর তাপমাত্রা ছিল ৩ডিগ্রীরও নীচে।

দিল্লীতে ঘুরে বেড়ানোর জন্য বিভিন্ন কোম্পানির বাস রয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ে এই বাসগুলি নির্দিষ্ট জায়গা থেকে টুরিস্টদেরকে তুলে নিয়ে সারাদিন বিভিন্ন দর্শনীয় জায়গা ঘুরিয়ে আবার নির্দিষ্ট জায়গায় নামিয়ে দেয়। তবে কেউ যদি নিজের মতো ঘুরতে চায় তবে কোন ট্যাক্সি বা অটোতে না ওঠায় ভালো। কারণ সেগুলিতে খরচ যেমন বেশী, তেমনি ঠকে যাবার সম্ভাবনাও বেশী। এই ট্যাক্সি বা অটোওয়ালারা টুরিস্টদেরকে শুধুই তাদের নির্ধারিত দোকানগুলিতে নিয়ে যাবে এবং সেখান থেকে চড়া দামে জিনিস-পত্র কিনতে বাধ্য করবে।

আমার মতে দিল্লী ঘোরার জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয় বাহন হচ্ছে ‘দিল্লী মেট্রো’। এটির মাধ্যমে খুব অল্প খরচে অর্থাৎ ৮ থেকে ৩০রুপির মধ্যে সবচে কম সময়ে এবং সবচেয়ে আরামদায়কভাবে গন্তব্যে পৌঁছানো যায়। দিল্লীতে মোটামুটি ১৫মিনিট হাঁটলে কোন না কোন মেট্রো স্টেশন পাওয়া যায়। আমি ‘সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েট’ স্টেশনে মেট্রোতে করে দিল্লী ভ্রমনের ম্যাপ খুঁজে পেয়েছিলাম।




দিল্লীর মেট্রোরেল হলুদ, কমলা, লাল, নীল, সবুজ ও বেগুনি এই ছয়টি লাইনে বিভক্ত। এছাড়া আরো কয়েকটি লাইনের কাজ চলছে। স্টেশনগুলির বেশিরভাগই মাটির ৩০থেকে ৪০ফুট উপরে। তবে মাটির ৭০থেকে ৮০ফুট নীচের স্টেশনের সংখ্যাও কম নয়। এর যেকোন একটি লাইনের ট্রেনে উঠলে যেকোন লাইনের যেকোন স্টেশনে যাওয়া সম্ভব। ধরুন আপনি ‘চাউরি বাজার’ স্টেশন থেকে ‘খান মার্কেট’ স্টেশনে যেতে চান। ‘চাউরি বাজার’ হলুদ লাইন আর ‘খান মার্কেট’ বেগুনি লাইনের মেট্রো। ‘চাউরি বাজার’ থেকেই ‘খান মার্কেট’ পর্যন্ত টিকিট কাটতে হবে। হলুদ লাইন আর বেগুনি লাইন যেখানে মিলেছে সে স্টেশনটির নাম হচ্ছে ‘সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েট’। ‘চাউরি বাজার’ থেকে ট্রেনে উঠে ‘সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েট’ স্টেশনে নামতে হবে। সেখানে হলুদ লাইনের প্ল্যাটফর্ম বদলে বেগুনি লাইনে গিয়ে আবার ট্রেনে উঠতে হবে। তারপর ‘খান মার্কেট’ স্টেশন আসলে নামতে হবে সেখানে।



আমি মেট্রোতে করে যেভাবে দিল্লী ঘুরেছি

১। জামে মসজিদঃ এটি দেখার জন্য নামতে হবে ‘চাউরি বাজার’ স্টেশনে। তারপর কারো কাছে জিজ্ঞাসা করলেই ৫মিনিট হেঁটে পৌঁছানো যাবে জামে মসজিদে। আমার দেখা সবচেয়ে বিশাল এবং সবচেয়ে সুন্দর মসজিদ এটি। ৬০টি সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে হয়। একসাথে ১০,০০০মানুষ নামায আদায় করতে পারে এখানে। সামনের খোলা অংশটিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে হাজার হাজার কবুতর । মসজিদ থেকেই এই কবুতরগুলিকে খাবার দেয়া হয়। এ মসজিদে আছে দু’টি সুউচ্চ মিনার । ৩০রুপির বিনিময়ে ২০২টি সিঁড়ি ভেঙ্গে চিপা টানেল দিয়ে এর চূড়ায় পৌঁছালে চোখের সামনে ভেসে উঠবে পুরো পুরানো দিল্লী।









২। মীনা বাজারঃ জামে মসজিদের মধ্যখানের গেট দিয়ে বের হলেই মীনা বাজার। ঢাকার গুলিস্তানের ফুটপাতের হকার্স মার্কেটের মতো দেখতে এ বাজারে নাকি একসময় মোঘল সম্রাট এবং সম্রাজ্ঞীরা ঘুরে বেড়াতো।

৩। চাঁদনি চকঃ দিল্লীর প্রধান রেলস্টেশন দু’টি। একটি হচ্ছে ‘দিল্লী স্টেশন’ আর অন্যটি ‘নিউদিল্লী স্টেশন’। ‘নিউদিল্লী স্টেশন’টির মেট্রো স্টেশন হচ্ছে ‘নিউদিল্লী’ এবং ‘দিল্লী স্টেশন’টির মেট্রো স্টেশন হচ্ছে ‘চাঁদনি চক’। পুরানো দিল্লীর অলিগলি ভরা বড় বড় বাজার এবং মেয়েদের চোখ ধাঁধানো পোশাকের দোকানগুলি সব এ এলাকাতেই।

৪। লাল কেল্লাঃ লাল কেল্লায় যেতে হলে নামতে হবে ‘চাঁদনি চক’ স্টেশনে। সেখান থেকে ৫মিনিট হাটলেই পৌঁছানো যাবে লাল কেল্লা। ভারতীয় হিসাবে ১৫রুপির টিকিট কেটে লাহোর গেট দিয়ে ঢুকে পড়ুন কেল্লার ভিতরে।














৫। কুতুব মিনারঃ দিল্লী বললেই চোখের সামনে যে দুটি জিনিস ভেসে ওঠে তার একটি হচ্ছে ‘দিল্লীকা লাড্ডু’ আর অন্যটি হচ্ছে ‘কুতুব মিনার’। কুতুব মিনার যেতে হলে নামতে হবে হলুদ লাইনের ‘কুতুব মিনার’ স্টেশনে। কিন্ত কুতুব মিনার এই স্টেশন থেকে অনেক দূরে। স্টেশনের বাইরে শেয়ারে কুতুব মিনার যাবার জন্য টেম্পুওয়ালারা ডাকতে থাকে। ১০ অথবা ২০রুপির বিনিময়ে টেম্পুতে করে সহজেই পৌঁছানো যাবে কুতুব মিনারে।











৬। লোটাস টেম্পলঃ পদ্মফুলের আকৃতিতে তৈরী বিশাল একটি মন্দির যেটি বাহাই নামক সম্প্রদায়ের জন্য নির্মিত। তবে সকল ধর্মের মানুষ তাদের ব্যাক্তিগত উপাসনা করতে পারে এখানে। লোটাস টেম্পলে যেতে হলে নামতে হবে বেগুনি লাইনের ‘কালকাজি মন্দির’ স্টেশনে। এই টেম্পলটির পাশে রয়েছে সুদৃশ্য এক পার্ক। পার্কটিতে ঢুকলে সারাটা দিন শুধু সেখানেই কাটিয়ে দিতে ইচ্ছে হয়।





৭। হুমায়ুন’স টম্বঃ মোঘল বাদশা হুমায়ুনের কবর রয়েছে দিল্লীতে। প্রথম দর্শনে এটিকে তাজমহল বলে ভ্রম হয়। হুমায়ুন’স টম্বে যেতে হলে নামতে হবে ‘জে এল এন স্টেডিয়াম’ অর্থাৎ ‘জহুরু-লাল-নেহেরু স্টেডিয়াম’ স্টেশনে। ছবির চাইতেও সুন্দর সাজানো স্টেশন এটি। স্টেশন থেকে বের হয়ে ২০থেকে ৩০রুপির রিক্সা ভাড়ায় পৌঁছাতে হয় হুমায়ুন’স টম্ব।






৮। সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েটঃ হলুদ ও বেগুনি লাইনের মিলিত স্টেশন হচ্ছে ‘সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েট’। ‘ইন্ডিয়া গেট’, ‘রাস্ট্রপতি ভবন’ এবং ‘পার্লামেন্ট হাউজ’ সবগুলিই এই এলাকায় অবস্থিত। সবগুলি ভালোভাবে দেখতে হলে এই এলাকায় কমপক্ষে ৩ঘন্টা হাঁটতে হবে। আমি অবশ্য ভয়াবহ কুয়াশার জন্য ‘রাস্ট্রপতি ভবন’ এবং ‘পার্লামেন্ট হাউজ’ খুঁজে পায়নি। শুধু ‘ইন্ডিয়া গেট’ দেখেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে। এই এলাকাটি ঘুরে দেখতে একটুও ক্লান্ত লাগবে না। তাছাড়া ইন্ডিয়া গেট যাবার পথে রয়েছে ফাস্টফুড আর আইসক্রীমের হাজার হাজার ভ্রাম্যমাণ দোকান। দিল্লীবাসীরা তাদের বৈকালিক সময়টা এখানেই কাটায়।









সবগুলি জায়গা একদিনে ঘুরে প্রচন্ড ক্লান্ত আমি তাড়াতাড়ি রাতের খাবার খেয়ে হোটেলে ফিরে শুয়ে পড়লাম। কালকে আমাকে আরো ভোরে উঠতে হবে। কারণ এদিন আমার যাত্রা শুরু হবে আগ্রার উদ্দেশ্য।

নোট*( দর্শনীয় স্থানগুলোতে প্রবেশের জন্য দু’ধরনের টিকিট থাকে। একটি ভারতীয়দের জন্য, যেটি সাধারণত ১০ অথবা ২০রুপির আর অন্যটি বিদেশীদের জন্য যেটি ১৫০ থেকে ২৫০ রুপির হয়ে থাকে। এছাড়া কোন কোন জায়গায় ক্যামেরার জন্যও টিকিট কাটতে হয়। সবসময় ভারতীয় টিকিট কাটবার চেষ্টা করুন। টিকিট কাউন্টারে গিয়ে সর্বনিম্ন শব্দ ব্যায় করবেন। আপনি যে ভারতীয় নন এটা যেন তারা বুঝতে না পারে। মন থেকে অনুশোচনা দূর করে ফেলুন। কারণ এসব স্থাপনা যখন তৈরী হয়েছিল তখন ভারতীয় উপমহাদেশ একসাথে ছিল। অর্থাৎ এসব স্থাপনা তৈরীতে আমাদের পূর্বপুরুষদের অর্থও ব্যায় হয়েছে।)

Popular Posts

Recent Posts

Text Widget